ঢাকা ০৬:০৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩
শিরোনাম ::
কুড়িগ্রামে বাংলা বর্ষবরন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ও  বৈশাখী শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত কুড়িগ্রামে নানা আয়োজনে একুশে টেলিভিশনের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন  কড়াই বরিশাল নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় ও দোয়া অনুষ্ঠিত কুড়িগ্রাম রিভার ভিউ উচ্চ বিদ্যালয়ে সীরাতুন্নবী মাহফিল ও এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের  চারদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করা হয়েছে বগুড়া ৬ আসনের উপনির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থী রেজাউল করিম বাদশা বিজয়ী ভূরুঙ্গামারীতে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে উপজেলা প্রকৌশলীকে প্রাণনাশের হুমকি, থানায় জিডি তেল সংকটে উত্তেজনা, পুলিশের উপর চড়াও হয়ে আটক ২ বাইকার, ইউএনও’র হস্তক্ষেপে মুচলেকায় মুক্তি কুড়িগ্রামের উলিপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পলেস্তারা খসে পড়ে, অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেলেন বাবা মেয়ে কুড়িগ্রামে প্রশ্নফাঁসের সাথে জড়িত শিক্ষকদের পুনর্বহালের প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন

যুগে যুগে ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ)

যুগে যুগে ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ)

হযরত আব্বাস নবী করীম (সাঃ) এর জন্ম প্রসঙ্গে ৯ম হিজরীতে একটি কবিতায় বলেছেন।
হে প্রিয় রাসূল,(সাঃ) আপনি যখন ভূমিষ্ঠ হন, তখন পৃথিবী উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল এবং আপনার নূরের ছটায় চতুর্দিক আলোময় হয়ে গিয়েছিল। ইবনে কাসির (আল বেদায়া ও নেহায়া)।

বিশিষ্ট সাহাবী হযরত হাসসান বিন সাবিত (রাঃ) মীলাদুন্নবী নবী (সাঃ) বর্ণনা প্রসঙ্গে একখানি কবিতাগ্রন্থ লিখেছিলেন এবং হুযুর নবী (সাঃ)-কে শুনিয়েছিলেন। পরবর্তীতে যার নাম রাখা হয়েছিল দিওয়ানে হাসসান বিন সাবিত।

হে প্রিয় রাসূল (সাঃ) আপনি সর্বপ্রকার দোষ-ত্রুটিমুক্ত হয়েই মাসুম হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছেন। মনে হয়, যেন আপনার ইচ্ছা অনুযায়ীই আপনার বর্তমান সুরত পয়দা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ আযানের মধ্যে আপন নামের সাথে আপনার নাম সংযোজন করেছেন, যখন মুয়াযযিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের আযানে উচ্চারণ করেন, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলাল্লাহ’ (সাঃ)। আর আল্লাহ আপন নামের অংশ দিয়ে তাঁর প্রিয় হাবীবের নাম রেখেছেন। আরশের অধিপতি হলেন ‘মাহমুদ’এবং ইনি হলেন ‘মুহাম্মদ(সাঃ)।মাহমুদ থেকে মুহাম্মদ নামের সৃষ্টি হয়েছে এবং আহাদ থেকে আহমদ নামের সৃষ্টি হয়েছে (আল হাদীস)।

প্রসিদ্ধ তাবেঈ হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ আমার একান্ত ইচ্ছা হয় যে, আমার যদি ওহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ’থাকতো তাহলে তা মিলাদুন্নবী (সাঃ) উপলক্ষে ব্যয় করতাম।

হযরত জুনাইদ বাগদাদী (রঃ) বলেনঃ
যে ব্যক্তি ঈদে মিলাদুন্নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ উপস্থিত হয়ে তাকে সম্মান প্রদর্শন করেছে, সে ঈমানের সফলতা লাভ করেছে।

হযরত মারুফ কারখী (রঃ) বলেনঃ
যে ব্যক্তি ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপলক্ষে পানাহারের আয়োজন করে মুসলিম ভাইদের একত্রিত করে, আলোকসজ্জা করে, নতুন পোষাক পরিধান করে এবং খুশবো, আতোর, গোলাপ ও লোবান প্রয়োগে নিজেকে সুগন্ধিযুক্ত করে; রোজ কিয়ামতে প্রতম শ্রেণীর নবীদের সাথে তার হাশর হবে এবং ইল্লীঈনের সর্বোচ্চ স্থানে সে অবস্থান করবে। (আন নেয়মাতুল কুবরা আলাল আলাম, পৃষ্ঠা নং-১১)

শাফেঈ মাযহাবের প্রবর্তক ইমাম শাফেঈ (রঃ) বলেনঃ
যদি কোন ব্যক্তি ঈদে-মিলাদুন্নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপলক্ষে মুসলিম ভাইদেরকে খাবার তৈরী করে মজলিসে আপ্যায়ন করে ও ইবাদত সম্পন্ন করে, রোজ কিয়ামতে সিদ্দীকিন, শাহাদা ও সালেহীনদের সাথে তার হাশর হবে এবং জান্নাতুন নাঈমে সে অবস্থান করবে। (আন নেয়মাতুল কুবরা আলাল আলাম, পৃষ্ঠা নং-১৩)

৯ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রঃ) বলেনঃ
মীলাদুন্নবী (সাঃ)উদযাপন যা মূলত, মানুষদের সমবেত করা, কুরআনের অংশ-বিশেষ তেলাওয়াত, মহানবী (সাঃ)-এর ধরাধামে শুভাগমন (বেলাদত) সংক্রান্ত ঘটনা ও লক্ষ্মণগুলোর বর্ণনা পেশ, অতঃপর তবাররুক (খাবার) বিতরণ করা। আর যে ব্যক্তি এর অনুশীলন করেন তিনি সওয়াব অর্জন করেন, কেননা এতে জড়িত রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর মহান মর্যাদার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং তাঁর সম্মানিত বেলাদতের প্রতি খুশি প্রকাশ।
(আল-হাওয়ী লিল্ ফাতাওয়ী ১ম খণ্ড, ২৯২ পৃষ্ঠা)

তিনি আরও বলেনঃ
যে গৃহে বা মসজিদে কিংবা মহল্লায় মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষ্যে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মীলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। তখন অবশ্যই সে গৃহ বা মসজিদ বা মহল্লা অসংখ্য ফেরেশতা দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে এবং উক্ত স্থান সমূহে যারা অবস্থান করে তাদের জন্য তারা সালাত পাঠ করে। (অর্থাৎ তাদের গুণাহর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে) এবং আল্লাহ তায়ালা তাদের সবাইকে সাধারণভাবে রহমত ও সন্তুষ্টি দ্বারা ভূষিত করেন। অতঃপর নূরের মালা পরিহিত ফেরেশতাকুল বিশেষতঃ হযরত জিব্রাঈল, মীকাঈল, ঈস্রাফীল ও আজরাঈল আলাইহিস সালাম মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষ্যে মাহফিল আয়োজনকারীর গুণাহ মাফের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে থাকেন সুবহানাল্লাহ।

তিনি আরো বলেনঃ
যে মুসলমানের গৃহে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মীলাদ পাঠ করা হয়, সে গৃহে বসবাসকারী ব্যক্তি দুর্ভিক্ষ, মহামারী, অগ্নি, পানি, পরনিন্দা, কুদৃষ্টি ও চুরি ইত্যাদির আক্রমণ থেকে মুক্ত থাকবে। সে ঘরে যার মৃত্যু হবে সে মৃত ব্যক্তি কবরে মুনকার নকীরের প্রশ্নের উত্তর অতি সহজে দিতে পারবে। যে ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মীলাদ কে সম্মান করতে চায়, তার জন্য ইহাই যথেষ্ট। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তির নিকট নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মীলাদের কোন মর্যাদা নেই, তার অন্তর এত নিকৃষ্ট হয়ে পড়বে যে, তার সামনে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিশ্বজোড়া প্রশংসাগীতি উচ্চারিত হলেও তার অন্তরে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য বিন্দুমাত্র মুহাব্বতের উদ্রেক হবে না। (আন নেয়মাতুল কুবরা আলাল আলাম, পৃষ্ঠা নং- ১৩ ও ১৪)।

হযরত সাররী সাক্বত্বী (রঃ) বলেনঃ

যে ব্যক্তি মিলাদ শারীফ পাঠ বা মিলাদুন্নবী (সাঃ) উদযাপন করার জন্য স্থান নির্দিষ্ট করল, সে যেন তার জন্য জান্নাতে রওজা বা বাগান নির্দিষ্ট করল। কেননা সে তা হুজুর পাক (সাঃ) এর মহব্বতের জন্যই করেছে।
(আন নেয়মাতুল কুবরা আলাল আলাম, পৃষ্ঠা নং- ১৩)

নবী করীম(সাঃ)এর নবুয়ত পরবর্তীকালে নিজেই সাহাবীদেরকে নিয়ে নিজের মিলাদ পড়েছেন এবং নিজ জীবনী আলোচনা করেছেন। যেমন- হযরত ইরবায ইবনে ছারিয়া (রাঃ) একদিন নবী করীম (সাঃ) কে তার আদি বৃত্তান্ত বর্ণনা করার জন্য আরয করলেন নবী করীম (সাঃ) এরশাদ করেন- আমি তখনও নবী ছিলাম- যখন আদম (আঃ)-এর দেহের উপাদান – মাটি ও পানি পৃথক পৃথক অবস্থায় ছিল। অর্থাৎ আদম সৃষ্টির পূর্বেই আমি নবী হিসেবে মনোনীত ছিলাম।

আমাকে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) দোয়া করে তার বংশে এনেছেন- সুতরাং আমি তার দোয়ার ফসল। হযরত ঈসা (আঃ) তার উম্মতের নিকট আমার আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। তারা উভয়েই আমার সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত ছিলেন। আমার আম্মা বিবি আমেনা আমার প্রসবকালীন সময়ে যে নূর তার গর্ভ হতে প্রকাশ পেয়ে সুদূর সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ আলোকিত করতে দেখেছিলেন, আমিই সেই নূর (মিশকাত শরীফ)।

মাহমুদ থেকে মুহাম্মদ গঠনে একটি ‘و’ অক্ষর বাদ দিতে হয় এবং আহাদ থেকে আহমদ গঠনে একটি “م” অক্ষর যোগ করতে হয়। যোগ বিয়োগের এই প্রক্রিয়াটি সুফী-সাধকগণের নিকট অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থাৎ মাহমুদ ও মুহাম্মদ এবং আহাদ ও আহমদ অতি ঘনিষ্ঠ। আল্লাহর নামটি চার অক্ষরবিশিষ্ট এবং মুহাম্মদ ও আহমদ নামটিও চার অক্ষরবিশিষ্ট। প্রধান ফেরেশতা, প্রধান আসমানী কিতাব, প্রধান সাহাবী, প্রধান মাযহাব ও প্রধান তরীকার সংখ্যাও চার এবং সৃষ্টির প্রধান উপাদানও চারটি। যথা, আব, আতিশ, খাক, বাদ (আগুন, পানি, মাটি, বায়ু)।

কালেমা তাইয়েবার তাওহীদ অংশ বারো অক্ষরবিশিষ্ট এবং রিসালাত অংশও বারো অক্ষরবিশিষ্ট। নবী করীম (সাঃ)-এর নামকরণ এবং কালেমাতে আল্লাহর সাথে মুহাম্মদ নাম সংযোজন, সবই আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। এতে মানুষের কোন হাত নেই। সুতরাং এই পরিকল্পনার তাৎপর্য পূর্ণভাবে উপলব্ধি করাও মানুষের সাধ্যাতীত ব্যপার।

এক সাহাবী জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ) প্রতি সোমবার আপনার রোযা রাখার কারণ কী? হুযুর(সাঃ) বললেন, এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই (সোমবার, ২৭ রমজান) আমার উপর কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। (সহীহ মুসলিম ২৬১)।

উল্লেখ্য, মুমিনের ঈদ মাত্র দু’টি নয়, মুমিনের ঈদ মোট ৯টি। যথাঃ- (১) ঈদে রামাদ্বান, (২) ঈদে কোরবান, (৩) ঈদে আরাফা, (৪) ঈদে জুমআ, (৫) ঈদে শবে বারাআত, (৬) ঈদে শবে ক্বোদর, (৭) ঈদে আশুরা, (৮) ঈদে নুযুলে মায়েদা এবং (৯) ঈদে মীলাদুন্নবী। সবগুলোই কোরআনে, হাদীসে ও বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ আছে।

এভাবে হযরত আবু বক্কর (রাঃ), হযরত ওমর (রাঃ), হযরত ওসমান (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) ৪ জন খলিফা  নিজ নিজ খেলাফতযুগেও পবিত্র বেলাদত শরীফ উপলক্ষে মিলাদ মাহফিল করতেন এবং মিলাদের ফযিলত বর্ণনা করতেন বলে মক্কা শরীফের তৎকালীন (৯৭৪) বিজ্ঞ মুজতাহিদ আলেম আল্লামা ইবনে হাজার হায়তামী (রঃ) স্বীয় রচিত আন-নিমাতুল কোবরা আলাল আলম গ্রন্থে তা উল্লেখ করেছেন।

এছাড়াও অন্যান্য সাহাবীগণ নবীজীর জীবদ্দশায় মীলাদুন্নবী মাহফিল করতেন।
হযরত আবু আমের আনসারীর মিলাদ মাহফিলঃ
হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে- তিনি বলেন, আমি একদিন নবী করীম (সাঃ)-এর সাথে মদীনাবাসী আবু আমের (রাঃ) এর গৃহে গমন করে দেখতে পেলাম যে তিনি তার সন্তানাদি ও আত্মীয়-স্বজনকে একত্রিত করে নবী করীম (সাঃ) এর পবিত্র বেলাদত সম্পর্কিত জন্ম বিবরণী শিক্ষা দিচ্ছেন এবং বলছেন যে, আজই সেই পবিত্র জন্ম তারিখ। এই মাহফিল দেখে নবী-করীম (সাঃ) খুশী হয়ে তাকে সুসংবাদ দিলেন,নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তোমার জন্য (মীলাদের কারণে) রহমতের অসংখ্য দরজা খুলে দিয়েছেন এবং ফেরেশতাগণ তোমাদের সকলের জন্য মাগফিরাত কামনা করছেন (আল্লামা জালালুদ্দীন সূয়ুতির সাবিলূল হুদা ও আল্লামা ইবনে দাহ্ইয়ার আত-তানভীর-৬০৪ হিঃ)।
হাক্বীক্বতে মুহম্মদী ও মীলাদে আহমদী পৃষ্ঠা- ৩৫৫)।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) কর্তৃক মিলাদ মাহফিলঃ
একদিন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) নিজগৃহে মিলাদ মাহফিলের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছিলেন। তিনি উপস্থিত সাহাবাগণের নিকট নবী করীম (সাঃ) এর পবিত্র বেলাদত সম্পর্কিত ঘটনাবলী বয়ান করছিলেন। শ্রোতামন্ডলী শুনতে শুনতে মীলাদুন্নবীর আনন্দ উপভোগ করছিলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা ও নবীজীর দরূদ পড়ছিলেন। এমন সময় নবী করীম(সাঃ) সেখানে উপস্থিত হয়ে এরশাদ করলেন, তোমাদের সকলের প্রতি আমার সুপারিশ ও শাফাআত অবধারিত হয়ে গেল।

আবু লাহাবের উক্ত ঘটনা সর্বশ্রেষ্ঠ হাদীস গ্রন্থ পবিত্র বোখারী শরীফেও বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটি নিম্নরুপ:

হযরত ওরওয়া ইবনে যোবাইয়ের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, সুয়াইবাহ আবু লাহাবের দাসী ছিলেন। আবু লাহাব হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বেলাদতের সুসংবাদ দেওয়ার কারণে (আনন্দিত হয়ে) সুয়াইবাহকে আযাদ করে দিয়েছিলো। অতঃপর সুয়াইবাহ হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দুধ পান করিয়েছিলেন। এরপর যখন আবু লাহাব মৃত্যুবরণ করল, তকন (এক বছর পর) তার ঘনিষ্টদের কেউ [হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু] তাকে স্বপ্নে শোচনীয় অবস্থায় দেখে তার উদ্দেশ্যে বলেন, “তোমার অবস্থা কেমন?” আবু লাহাব তদুত্তরে বললো, “তোমাদের নিকট থেকে আসার পর আমি কোন প্রকার শান্তি পাইনি, কেবল আমি যে (আল্লাহর হাবীবের জন্ম সংবাদ বা মীলাদ শরীফের খুশিতে) সুয়াইবাহকে (তর্জনী ও মধ্যমা দুটি আঙ্গুলের ইশারায়) আযাদ করেছিলাম, ঐ কারণে (প্রতি সোমবার আঙ্গুল দু’টির মধ্যে কিছু পানি জমে থাকে) আমি ওই পানি চুষে থাকি ও প্রতি সোমবার আযাবকে হাল্কা বোধ করে থাকি। (বুখারী শরীফ)।

বোখারী শরীফে উক্ত পৃষ্ঠায়ই শেষের দিকে এ হাদীসের পাদটিকায় বর্ণিত আছে :

সুয়াইবাহ আবু লাহাবকে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্মের সুসংবাদ দেওয়ার কারণে আবু লাহাব তাকে আযাদ করে দিয়েছিলো। অতঃপর এ আযাদ করাটা (পরকালে) আবু লাহাবের উপকারে এসেছে। এ কাজ তার উপকারে আসার অর্থ হলো- তার এ কর্ম হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বরকতে অবশিষ্ট ছিল। অন্যান্য কাজের ন্যায় বিনষ্ট হয়ে যায়নি।

কিয়াম করে মিলাদ মাহফিলে নবী করীম (সাঃ) এর প্রশংসামূলক কবিতা ও না’ত পাঠ করা এবং সালাম পেশ করার এটাই বড় দলীল। এরূপ করা সুন্নাত এবং উত্তম বলে মক্কা-মদীনার ৯০ জন উলামা ১২৮৬ হিজরীতে নিম্নোক্ত ফতোয়া দিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রে প্রেরণ করেছেন।

হে মুসলমানগণ আপনারা জেনে রাখুন যে, মীলাদুন্নবী (সাঃ)-এর আলোচনা ও তার সমস্ত শান-মান বর্ণনা করা এবং ঐ মাহফিলে উপস্থিত হওয়া সবই সুন্নাত। বর্ণিত আছে যে, হযরত হাসসান বিন সাবিত (রাঃ) কিয়াম অবস্থায় রাসুলুল্লাহ(সাঃ)-এর পক্ষে হুযুরের উপস্থিতিতে হুযুর (সাঃ)-এর গৌরবগাথা পেশ করতেন, আর সাহাবীগণ তা শুনার জন্য একত্রিত হতেন। (ফতোয়ায়ে হারামাঈন) একজনের কিয়ামই সকলের জন্য দলীল স্বরূপ।

উপরের আলোচনা থেকে প্রমানিত হলো যে, যুগে যুগে মীলাদুন্নবীর চর্চা চলে আসছে। ঈদে মীলাদুন্নবীতে নূরে মুহাম্মদী তথা সৃষ্টির আদি থেকে ৬৩ বৎসর পর্যন্ত নবীজীর সার্বিক জীবনের আলোচনা স্থান পায়। সেজন্যই নবী, ওলী, গাউস-কুতুব – সবাই মীলাদুন্নবীর চর্চা করতেন। মীলাদুন্নবী পালনকারীরা শান্তিকামী।

মোঃ বেলাল হোসেন
রৌমারী কুড়িগ্রাম

 

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

কুড়িগ্রামে বাংলা বর্ষবরন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ও  বৈশাখী শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত

যুগে যুগে ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ)

আপডেট সময় : ০৩:৫০:১৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫

যুগে যুগে ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ)

হযরত আব্বাস নবী করীম (সাঃ) এর জন্ম প্রসঙ্গে ৯ম হিজরীতে একটি কবিতায় বলেছেন।
হে প্রিয় রাসূল,(সাঃ) আপনি যখন ভূমিষ্ঠ হন, তখন পৃথিবী উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল এবং আপনার নূরের ছটায় চতুর্দিক আলোময় হয়ে গিয়েছিল। ইবনে কাসির (আল বেদায়া ও নেহায়া)।

বিশিষ্ট সাহাবী হযরত হাসসান বিন সাবিত (রাঃ) মীলাদুন্নবী নবী (সাঃ) বর্ণনা প্রসঙ্গে একখানি কবিতাগ্রন্থ লিখেছিলেন এবং হুযুর নবী (সাঃ)-কে শুনিয়েছিলেন। পরবর্তীতে যার নাম রাখা হয়েছিল দিওয়ানে হাসসান বিন সাবিত।

হে প্রিয় রাসূল (সাঃ) আপনি সর্বপ্রকার দোষ-ত্রুটিমুক্ত হয়েই মাসুম হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছেন। মনে হয়, যেন আপনার ইচ্ছা অনুযায়ীই আপনার বর্তমান সুরত পয়দা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ আযানের মধ্যে আপন নামের সাথে আপনার নাম সংযোজন করেছেন, যখন মুয়াযযিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের আযানে উচ্চারণ করেন, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলাল্লাহ’ (সাঃ)। আর আল্লাহ আপন নামের অংশ দিয়ে তাঁর প্রিয় হাবীবের নাম রেখেছেন। আরশের অধিপতি হলেন ‘মাহমুদ’এবং ইনি হলেন ‘মুহাম্মদ(সাঃ)।মাহমুদ থেকে মুহাম্মদ নামের সৃষ্টি হয়েছে এবং আহাদ থেকে আহমদ নামের সৃষ্টি হয়েছে (আল হাদীস)।

প্রসিদ্ধ তাবেঈ হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ আমার একান্ত ইচ্ছা হয় যে, আমার যদি ওহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ’থাকতো তাহলে তা মিলাদুন্নবী (সাঃ) উপলক্ষে ব্যয় করতাম।

হযরত জুনাইদ বাগদাদী (রঃ) বলেনঃ
যে ব্যক্তি ঈদে মিলাদুন্নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ উপস্থিত হয়ে তাকে সম্মান প্রদর্শন করেছে, সে ঈমানের সফলতা লাভ করেছে।

হযরত মারুফ কারখী (রঃ) বলেনঃ
যে ব্যক্তি ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপলক্ষে পানাহারের আয়োজন করে মুসলিম ভাইদের একত্রিত করে, আলোকসজ্জা করে, নতুন পোষাক পরিধান করে এবং খুশবো, আতোর, গোলাপ ও লোবান প্রয়োগে নিজেকে সুগন্ধিযুক্ত করে; রোজ কিয়ামতে প্রতম শ্রেণীর নবীদের সাথে তার হাশর হবে এবং ইল্লীঈনের সর্বোচ্চ স্থানে সে অবস্থান করবে। (আন নেয়মাতুল কুবরা আলাল আলাম, পৃষ্ঠা নং-১১)

শাফেঈ মাযহাবের প্রবর্তক ইমাম শাফেঈ (রঃ) বলেনঃ
যদি কোন ব্যক্তি ঈদে-মিলাদুন্নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপলক্ষে মুসলিম ভাইদেরকে খাবার তৈরী করে মজলিসে আপ্যায়ন করে ও ইবাদত সম্পন্ন করে, রোজ কিয়ামতে সিদ্দীকিন, শাহাদা ও সালেহীনদের সাথে তার হাশর হবে এবং জান্নাতুন নাঈমে সে অবস্থান করবে। (আন নেয়মাতুল কুবরা আলাল আলাম, পৃষ্ঠা নং-১৩)

৯ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রঃ) বলেনঃ
মীলাদুন্নবী (সাঃ)উদযাপন যা মূলত, মানুষদের সমবেত করা, কুরআনের অংশ-বিশেষ তেলাওয়াত, মহানবী (সাঃ)-এর ধরাধামে শুভাগমন (বেলাদত) সংক্রান্ত ঘটনা ও লক্ষ্মণগুলোর বর্ণনা পেশ, অতঃপর তবাররুক (খাবার) বিতরণ করা। আর যে ব্যক্তি এর অনুশীলন করেন তিনি সওয়াব অর্জন করেন, কেননা এতে জড়িত রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর মহান মর্যাদার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং তাঁর সম্মানিত বেলাদতের প্রতি খুশি প্রকাশ।
(আল-হাওয়ী লিল্ ফাতাওয়ী ১ম খণ্ড, ২৯২ পৃষ্ঠা)

তিনি আরও বলেনঃ
যে গৃহে বা মসজিদে কিংবা মহল্লায় মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষ্যে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মীলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। তখন অবশ্যই সে গৃহ বা মসজিদ বা মহল্লা অসংখ্য ফেরেশতা দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে এবং উক্ত স্থান সমূহে যারা অবস্থান করে তাদের জন্য তারা সালাত পাঠ করে। (অর্থাৎ তাদের গুণাহর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে) এবং আল্লাহ তায়ালা তাদের সবাইকে সাধারণভাবে রহমত ও সন্তুষ্টি দ্বারা ভূষিত করেন। অতঃপর নূরের মালা পরিহিত ফেরেশতাকুল বিশেষতঃ হযরত জিব্রাঈল, মীকাঈল, ঈস্রাফীল ও আজরাঈল আলাইহিস সালাম মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষ্যে মাহফিল আয়োজনকারীর গুণাহ মাফের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে থাকেন সুবহানাল্লাহ।

তিনি আরো বলেনঃ
যে মুসলমানের গৃহে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মীলাদ পাঠ করা হয়, সে গৃহে বসবাসকারী ব্যক্তি দুর্ভিক্ষ, মহামারী, অগ্নি, পানি, পরনিন্দা, কুদৃষ্টি ও চুরি ইত্যাদির আক্রমণ থেকে মুক্ত থাকবে। সে ঘরে যার মৃত্যু হবে সে মৃত ব্যক্তি কবরে মুনকার নকীরের প্রশ্নের উত্তর অতি সহজে দিতে পারবে। যে ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মীলাদ কে সম্মান করতে চায়, তার জন্য ইহাই যথেষ্ট। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তির নিকট নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মীলাদের কোন মর্যাদা নেই, তার অন্তর এত নিকৃষ্ট হয়ে পড়বে যে, তার সামনে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিশ্বজোড়া প্রশংসাগীতি উচ্চারিত হলেও তার অন্তরে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য বিন্দুমাত্র মুহাব্বতের উদ্রেক হবে না। (আন নেয়মাতুল কুবরা আলাল আলাম, পৃষ্ঠা নং- ১৩ ও ১৪)।

হযরত সাররী সাক্বত্বী (রঃ) বলেনঃ

যে ব্যক্তি মিলাদ শারীফ পাঠ বা মিলাদুন্নবী (সাঃ) উদযাপন করার জন্য স্থান নির্দিষ্ট করল, সে যেন তার জন্য জান্নাতে রওজা বা বাগান নির্দিষ্ট করল। কেননা সে তা হুজুর পাক (সাঃ) এর মহব্বতের জন্যই করেছে।
(আন নেয়মাতুল কুবরা আলাল আলাম, পৃষ্ঠা নং- ১৩)

নবী করীম(সাঃ)এর নবুয়ত পরবর্তীকালে নিজেই সাহাবীদেরকে নিয়ে নিজের মিলাদ পড়েছেন এবং নিজ জীবনী আলোচনা করেছেন। যেমন- হযরত ইরবায ইবনে ছারিয়া (রাঃ) একদিন নবী করীম (সাঃ) কে তার আদি বৃত্তান্ত বর্ণনা করার জন্য আরয করলেন নবী করীম (সাঃ) এরশাদ করেন- আমি তখনও নবী ছিলাম- যখন আদম (আঃ)-এর দেহের উপাদান – মাটি ও পানি পৃথক পৃথক অবস্থায় ছিল। অর্থাৎ আদম সৃষ্টির পূর্বেই আমি নবী হিসেবে মনোনীত ছিলাম।

আমাকে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) দোয়া করে তার বংশে এনেছেন- সুতরাং আমি তার দোয়ার ফসল। হযরত ঈসা (আঃ) তার উম্মতের নিকট আমার আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। তারা উভয়েই আমার সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত ছিলেন। আমার আম্মা বিবি আমেনা আমার প্রসবকালীন সময়ে যে নূর তার গর্ভ হতে প্রকাশ পেয়ে সুদূর সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ আলোকিত করতে দেখেছিলেন, আমিই সেই নূর (মিশকাত শরীফ)।

মাহমুদ থেকে মুহাম্মদ গঠনে একটি ‘و’ অক্ষর বাদ দিতে হয় এবং আহাদ থেকে আহমদ গঠনে একটি “م” অক্ষর যোগ করতে হয়। যোগ বিয়োগের এই প্রক্রিয়াটি সুফী-সাধকগণের নিকট অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থাৎ মাহমুদ ও মুহাম্মদ এবং আহাদ ও আহমদ অতি ঘনিষ্ঠ। আল্লাহর নামটি চার অক্ষরবিশিষ্ট এবং মুহাম্মদ ও আহমদ নামটিও চার অক্ষরবিশিষ্ট। প্রধান ফেরেশতা, প্রধান আসমানী কিতাব, প্রধান সাহাবী, প্রধান মাযহাব ও প্রধান তরীকার সংখ্যাও চার এবং সৃষ্টির প্রধান উপাদানও চারটি। যথা, আব, আতিশ, খাক, বাদ (আগুন, পানি, মাটি, বায়ু)।

কালেমা তাইয়েবার তাওহীদ অংশ বারো অক্ষরবিশিষ্ট এবং রিসালাত অংশও বারো অক্ষরবিশিষ্ট। নবী করীম (সাঃ)-এর নামকরণ এবং কালেমাতে আল্লাহর সাথে মুহাম্মদ নাম সংযোজন, সবই আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। এতে মানুষের কোন হাত নেই। সুতরাং এই পরিকল্পনার তাৎপর্য পূর্ণভাবে উপলব্ধি করাও মানুষের সাধ্যাতীত ব্যপার।

এক সাহাবী জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ) প্রতি সোমবার আপনার রোযা রাখার কারণ কী? হুযুর(সাঃ) বললেন, এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই (সোমবার, ২৭ রমজান) আমার উপর কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। (সহীহ মুসলিম ২৬১)।

উল্লেখ্য, মুমিনের ঈদ মাত্র দু’টি নয়, মুমিনের ঈদ মোট ৯টি। যথাঃ- (১) ঈদে রামাদ্বান, (২) ঈদে কোরবান, (৩) ঈদে আরাফা, (৪) ঈদে জুমআ, (৫) ঈদে শবে বারাআত, (৬) ঈদে শবে ক্বোদর, (৭) ঈদে আশুরা, (৮) ঈদে নুযুলে মায়েদা এবং (৯) ঈদে মীলাদুন্নবী। সবগুলোই কোরআনে, হাদীসে ও বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ আছে।

এভাবে হযরত আবু বক্কর (রাঃ), হযরত ওমর (রাঃ), হযরত ওসমান (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) ৪ জন খলিফা  নিজ নিজ খেলাফতযুগেও পবিত্র বেলাদত শরীফ উপলক্ষে মিলাদ মাহফিল করতেন এবং মিলাদের ফযিলত বর্ণনা করতেন বলে মক্কা শরীফের তৎকালীন (৯৭৪) বিজ্ঞ মুজতাহিদ আলেম আল্লামা ইবনে হাজার হায়তামী (রঃ) স্বীয় রচিত আন-নিমাতুল কোবরা আলাল আলম গ্রন্থে তা উল্লেখ করেছেন।

এছাড়াও অন্যান্য সাহাবীগণ নবীজীর জীবদ্দশায় মীলাদুন্নবী মাহফিল করতেন।
হযরত আবু আমের আনসারীর মিলাদ মাহফিলঃ
হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে- তিনি বলেন, আমি একদিন নবী করীম (সাঃ)-এর সাথে মদীনাবাসী আবু আমের (রাঃ) এর গৃহে গমন করে দেখতে পেলাম যে তিনি তার সন্তানাদি ও আত্মীয়-স্বজনকে একত্রিত করে নবী করীম (সাঃ) এর পবিত্র বেলাদত সম্পর্কিত জন্ম বিবরণী শিক্ষা দিচ্ছেন এবং বলছেন যে, আজই সেই পবিত্র জন্ম তারিখ। এই মাহফিল দেখে নবী-করীম (সাঃ) খুশী হয়ে তাকে সুসংবাদ দিলেন,নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তোমার জন্য (মীলাদের কারণে) রহমতের অসংখ্য দরজা খুলে দিয়েছেন এবং ফেরেশতাগণ তোমাদের সকলের জন্য মাগফিরাত কামনা করছেন (আল্লামা জালালুদ্দীন সূয়ুতির সাবিলূল হুদা ও আল্লামা ইবনে দাহ্ইয়ার আত-তানভীর-৬০৪ হিঃ)।
হাক্বীক্বতে মুহম্মদী ও মীলাদে আহমদী পৃষ্ঠা- ৩৫৫)।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) কর্তৃক মিলাদ মাহফিলঃ
একদিন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) নিজগৃহে মিলাদ মাহফিলের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছিলেন। তিনি উপস্থিত সাহাবাগণের নিকট নবী করীম (সাঃ) এর পবিত্র বেলাদত সম্পর্কিত ঘটনাবলী বয়ান করছিলেন। শ্রোতামন্ডলী শুনতে শুনতে মীলাদুন্নবীর আনন্দ উপভোগ করছিলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা ও নবীজীর দরূদ পড়ছিলেন। এমন সময় নবী করীম(সাঃ) সেখানে উপস্থিত হয়ে এরশাদ করলেন, তোমাদের সকলের প্রতি আমার সুপারিশ ও শাফাআত অবধারিত হয়ে গেল।

আবু লাহাবের উক্ত ঘটনা সর্বশ্রেষ্ঠ হাদীস গ্রন্থ পবিত্র বোখারী শরীফেও বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটি নিম্নরুপ:

হযরত ওরওয়া ইবনে যোবাইয়ের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, সুয়াইবাহ আবু লাহাবের দাসী ছিলেন। আবু লাহাব হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বেলাদতের সুসংবাদ দেওয়ার কারণে (আনন্দিত হয়ে) সুয়াইবাহকে আযাদ করে দিয়েছিলো। অতঃপর সুয়াইবাহ হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দুধ পান করিয়েছিলেন। এরপর যখন আবু লাহাব মৃত্যুবরণ করল, তকন (এক বছর পর) তার ঘনিষ্টদের কেউ [হযরত আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু] তাকে স্বপ্নে শোচনীয় অবস্থায় দেখে তার উদ্দেশ্যে বলেন, “তোমার অবস্থা কেমন?” আবু লাহাব তদুত্তরে বললো, “তোমাদের নিকট থেকে আসার পর আমি কোন প্রকার শান্তি পাইনি, কেবল আমি যে (আল্লাহর হাবীবের জন্ম সংবাদ বা মীলাদ শরীফের খুশিতে) সুয়াইবাহকে (তর্জনী ও মধ্যমা দুটি আঙ্গুলের ইশারায়) আযাদ করেছিলাম, ঐ কারণে (প্রতি সোমবার আঙ্গুল দু’টির মধ্যে কিছু পানি জমে থাকে) আমি ওই পানি চুষে থাকি ও প্রতি সোমবার আযাবকে হাল্কা বোধ করে থাকি। (বুখারী শরীফ)।

বোখারী শরীফে উক্ত পৃষ্ঠায়ই শেষের দিকে এ হাদীসের পাদটিকায় বর্ণিত আছে :

সুয়াইবাহ আবু লাহাবকে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্মের সুসংবাদ দেওয়ার কারণে আবু লাহাব তাকে আযাদ করে দিয়েছিলো। অতঃপর এ আযাদ করাটা (পরকালে) আবু লাহাবের উপকারে এসেছে। এ কাজ তার উপকারে আসার অর্থ হলো- তার এ কর্ম হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বরকতে অবশিষ্ট ছিল। অন্যান্য কাজের ন্যায় বিনষ্ট হয়ে যায়নি।

কিয়াম করে মিলাদ মাহফিলে নবী করীম (সাঃ) এর প্রশংসামূলক কবিতা ও না’ত পাঠ করা এবং সালাম পেশ করার এটাই বড় দলীল। এরূপ করা সুন্নাত এবং উত্তম বলে মক্কা-মদীনার ৯০ জন উলামা ১২৮৬ হিজরীতে নিম্নোক্ত ফতোয়া দিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রে প্রেরণ করেছেন।

হে মুসলমানগণ আপনারা জেনে রাখুন যে, মীলাদুন্নবী (সাঃ)-এর আলোচনা ও তার সমস্ত শান-মান বর্ণনা করা এবং ঐ মাহফিলে উপস্থিত হওয়া সবই সুন্নাত। বর্ণিত আছে যে, হযরত হাসসান বিন সাবিত (রাঃ) কিয়াম অবস্থায় রাসুলুল্লাহ(সাঃ)-এর পক্ষে হুযুরের উপস্থিতিতে হুযুর (সাঃ)-এর গৌরবগাথা পেশ করতেন, আর সাহাবীগণ তা শুনার জন্য একত্রিত হতেন। (ফতোয়ায়ে হারামাঈন) একজনের কিয়ামই সকলের জন্য দলীল স্বরূপ।

উপরের আলোচনা থেকে প্রমানিত হলো যে, যুগে যুগে মীলাদুন্নবীর চর্চা চলে আসছে। ঈদে মীলাদুন্নবীতে নূরে মুহাম্মদী তথা সৃষ্টির আদি থেকে ৬৩ বৎসর পর্যন্ত নবীজীর সার্বিক জীবনের আলোচনা স্থান পায়। সেজন্যই নবী, ওলী, গাউস-কুতুব – সবাই মীলাদুন্নবীর চর্চা করতেন। মীলাদুন্নবী পালনকারীরা শান্তিকামী।

মোঃ বেলাল হোসেন
রৌমারী কুড়িগ্রাম